শিশুতোষ গল্প- ’প্রিয় বই’ -জনকন্ঠ- ৩১ মার্চ ২০১৮

P_20180331_110559_1

http://edailyjanakantha.com/?d=2018-3-31&p=10

দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩১ মার্চ ২০১৮

প্রিয় বই / বইমেলায় যাবো রে

মো. রহমত উল্লাহ্‌

ফুফুর বাসায় বেড়াতে এসেছে মাহির। রাতে খাওয়ার পর বসলো আড্ডায়। তিন ভাই বোনকে সে উপহার দিলো তিনটি বই। প্রিয় লেখকদের বই পেয়ে অনেক খুশি তারা। প্রতিটি বই খুলেই দেখে লেখকের অটোগ্রাফ। জানতে চায়, তুমি কীভাবে পেলে এই অটোগ্রাফ? মাহির বলে, বই মেলায় দেখা হয়েছিল ওনাদের সাথে। ও! তাই নাকি? তুমি বই মেলায় গিয়েছিলে? নিজে দেখেছো ওনাদের? কথা বলেছো ওনার সাথে? কী বললেন তোমাকে? আর কে কে গিয়েছিলো বই মেলায়? এমন অনেক প্রশ্ন করে তিনজন। মাহির বলে, সে তো অনেক কথা। অনেক সময় লাগবে বলতে। মাইমুনা বলে, তুমি বলো, আমি শুনতে চাই। সাথে সাথে আবদার করে নাসিফ ও নায়িম। হ্যাঁ হ্যাঁ, বলো মাহির ভাইয়া। আমরাও শোনতে চাই সব। মাহির বলে, আচ্ছা, শোন তাহলে।

সেদিন ছিলো শুক্রবার। সকালে যেনো উৎসবে পরিনত হলো স্কুলের মাঠ। আগের ঘোষণা অনুযায়ী সবাই হাজির সকাল সাতটায়। সবার পরনে স্কুল ড্রেস। তিথিমণির হাতে হাত ঠেঁকিয়ে তালি বাজালো মায়িশা। বললো, ‘হাহ্ হা হুর্ রে’। তিথিমণি বললো, ‘বইমেলায় যাবো রে’। ‘প্রিয় বই কিনবো রে..।’ একই কাজ করতে লাগলো ছোটবড় সবাই। করতে লাগলো হাসাহাসি আর ছুটাছুটি। যেনো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ! মুখে মুখে একই স্লোগান। ‘হাহ্ হা হুর্ রে, বইমেলায় যাবো রে…।’ ‘হাহ্ হা হুর্ রে, প্রিয় বই কিনবো রে…।’

স্কুলের নাম লেখা ক্যাপ পরলেন হেডস্যার, অন্যান্য স্যার ও ম্যাডাম। আমাদেরও পরিয়ে দিলেন একই রকম ক্যাপ। বুকে ঝুলিয়ে দিলেন বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। ‘ভালো বই পড়বো, ভালো জীবন গড়বো।’ ‘বই পড়া ছাড়বো না, ভাল কাজে হারবো না।’ ‘যা-ই হোক দাম তার, বই সেরা উপহার।’ …। সকাল আটটায় ছাড়লো আমাদের বাস।

অনেক মজা হলো বাসে। গান, স্লোগান, হৈ চৈ, হাততালি…। স্বপ্নের মতো চলে গেলো সময়। পৌঁছে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে। দেখে নিলাম অপরাজেয় বাংলা। হেডস্যার বললেন, এটি হচ্ছে অপরাভব বাঙালির প্রতীক।

এরপর এলাম বাংলা একাডেমির সামনে। টিফিন সেরে নিতে বললেন স্যার। গাছের ছায়ায় বসে গেলাম আমরা। খেতে শুরু করলাম সাথে রাখা টিফিন। যেনো পিকনিক। স্যারও মুখে তুলে নিলেন আমাদের খাবার।
এগারটায় ঢুকে গেলাম বইমেলায়। ওয়াও, কী সুন্দর! বই আর বই। হরেক রকম বই। অনেক বইয়ের দোকান। শিশু চত্বরে গিয়ে দেখি রঙের মেলা। রঙিন সব বইয়ের দোকান। রঙিন সব মজার মজার বই। যেনো স্বপ্নপুরী! বইয়ের মাঝে হারিয়ে গেলাম আমরা। যেটি পড়ি সেটিই ভালো লাগে। একটা থেকে আরেকটা ভালো। কোনটা রেখে কোনটা কিনি! কয়েকটা বই কিনতেই টাকা শেষ!
আমাদের দেখে জড়ো হলেন অনেকেই। কবি, লেখক, সাংবাদিক…। কয়েক জনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন হেডস্যার। অনেক বড় বড় লেখক। বিভিন্ন দিবসে স্কুলে পুরস্কার পেয়েছি তাঁদের বই। তোমাদের এসব বইয়ের লেখকও ছিলেন সেখানে। সময় কাটিয়েছেন আমাদের সাথে। আদর করেছেন, গল্প করেছেন, অটোগ্রাফ দিয়েছেন। অনেক বই পড়তে বলেছেন।
মাইমুনা বললো, হ্যাঁ, খুব মজা হয়েছে। নায়িম বললো, ইস! আমাদের হেডস্যার যদি…। নাসিফ বললো, আমাদের স্যারও ভালো। আমরা বলবো, আগামী বইমেলায় আমাদের নিয়ে যেতে। আমরাও কিনবো প্রিয় বই।
মাহির বললো, আচ্ছা, এখন শোন, পরে কী ঘটলো। আমাদের ফেরার সময় হলো। আগের কথা মতো জমা হলাম বটতলায়। সবার মুখে মুখে হাসি। হাতে হাতে প্রিয় বই। যেনো বইদিবস। আমাদের সাক্ষাতকার নিলেন বিভিন্ন টিভির সাংবাদিক। এবার ফেরার পালা।
এমন সময় জানা গেলো, হাফসা আসেনি। হাফসার গ্রুপ টিচার বললেন, তাকে পাওয়া যাচ্ছেনা। সবার মুখ মলিন! হেডস্যার বললেন, সবাই এখানে দাঁড়াও চুপচাপ। কেউ ছুটাছুটি করবেনা। যাঁরা গ্রুপ টিচার, তাঁরা খেয়াল রাখুন। যাঁরা গ্রুপ টিচার নন, তাঁরা খুঁজতে যান। ফোনে যোগাযোগ রাখবেন। ফিরে আসবেন পনের মিনিটের মধ্যে।
আমরা প্রার্থনা করছি আর ভাবছি। কী হবে এখন! কী হবে এখন! পনের মিনিট যেনো পনের দিন! ফোন আসে, সুখবর আসে না। একে একে ফিরে এলেন সব স্যার। কেউ খুঁজে পেলেননা হাফসাকে। কান্না শুরু করলো হাফসার কয়েকজন ক্লাসমেট। কপাল মুছতে লাগলেন হেডস্যার।
মেলার ঘোষণা মঞ্চে নিখোঁজ সংবাদ জানালেন বাংলা ম্যাডাম। মাইকে বারবার ভেসে আসছে ঘোষণা। … হাফসা তুমি বটতলায় ফিরে এসো। কিন্তু ফিরে আসছে না হাফসা। সবাই ভাবছে, কী করা যায় এখন। হাফসার ক্লাসমেটদের সাথে কান্না শুরু করলো আরও অনেকেই।
হেডস্যার বললেন, এবার আমি খোঁজতে যাই। তিথিমণি, দুর্জয়, তোমরা তো বই মেলায় এসেছো অনেকবার। তোমরা এসো আমার সাথে। মাহির, মায়িশা, তোমরাও এসো। গেলাম শিশু চত্বরে। পেলাম না। গেলাম অন্য সবখানে। খোঁজলাম সব বইয়ের দোকানে। গেটের বাইরেও গেলাম। কোত্থাও পেলাম না!
দুর্জয়ের কথায় আবার এলাম শিশু চত্বরে। সিসিমপুর মঞ্চে চলছে টুকটুকি, হালুম ও ইকরিদের খেলা। ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেলো দুর্জয়। তাকালো এদিক সেদিক, সবদিক। সামনে বসে একমনে খেলা দেখছে হাফসা। কয়েকবার হাফসা, হাফসা… বলে ডাকলো দুর্জয়। খেয়ালই করলো না হাফসা। কাছে গিয়ে টুঁকা দিলো মাথায়। হাফসা বললো, দুর্জয় ভাইয়া, দেখো কী মজার খেলা! দুর্জয় বললো, সবাই তোমাকে খোঁজছে। বাসায় যাবে না? এখন চলো। হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো হাফসাকে। মায়ের মতো জড়িয়ে ধরলেন স্যার।
আমরা ফিরে এলাম বটতলায়। তাকে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলো সবাই। জানতে চাইলো, কোথায় ছিলো, কীভাবে ছিলো…। দুর্জয় বললো, ইকরিদের খেলা দেখছিলো মাছরাঙার মতো। ভীড়ের মাঝে বসেছিলো একমনে। মাথায় ক্যাপনেই বলেই পাওয়া যাচ্ছিলো না তাকে। স্যার বললেন, দেখলে তো, দলছুট হলে কী হয়? তাই দলছুট হতে মানা করেছিলাম তোমাদের। নিজের ভুল বুঝতে পেরে নীরব হাফসা। মায়িশা বললো, তোমার ক্যাপ কোথায়? বই কিননি তুমি? এবার কান্না জুড়ে দিলো হাফসা। খেয়াল করলো, হারিয়ে গেছে বই ও ক্যাপ। তাকে আদর করলো সবাই। একটা বই দিলো তিথিমণি। খুব খুশি হলো হাফসা। হাসি ফুটলো সবার মুখে।
স্যার বললেন, চলো, এখন ফিরে যাই। আজ আর সময় নেই। যাওয়া যাবেনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। দেখা হবেনা স্বাধীনতাস্তম্ভ। পরে আসবো একদিন। অনেক আনন্দ করে ফিরে এলাম বইমেলা থেকে।
স্বাধীনতাস্তম্ভ কী? জানতে চাইলো নায়িম। মাহির বললো, সেখানে তো যাইনি। স্যারের কাছে শুনেছি, সেখানেই আত্মসমর্পন করেছিলো পাকিস্তানী সেনারা। সেখানেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এখন শোন, কী হলো পরদিন।
সকাল সাতটা। ক্লাস শুরু হয়নি তখনও। স্কুলের মাঠে পা রাখলেন হেডস্যার। ছুটে এলো ইউশা, শোয়াইব ও তাদের বন্ধুরা। বললো, স্যার, টিভিতে দেখেছি আপনাদের। সবাইকে নিয়ে গেলেন বই মেলায়। আমাদের তো নিলেন না। তাদের মাথায় হাত বুলালেন স্যার। আদর করে নিয়ে গেলেন নিজের রুমে। বরাবরের মতো চকলেট দিলেন হাতে হাতে। বললেন, এতজনের সাথে কি যেতে পারতে তোমরা? হারিয়ে যেতে যদি বইমেলায়? ইউশা বললো, হারাবো কেনো স্যার? আমরা তো বড় হয়েছি। এখন ক্লাস টুতে পড়ি। স্যার বললেন, ঠিক আছে, তোমাদেরও নিয়ে যাবো আগামীতে। হৈ হৈ করে উঠলো তারা। ‘হাহ্ হা হুর্ রে, বইমেলায় যাবো রে…।’ ‘হাহ্ হা হুর্ রে, প্রিয় বই কিনবো রে…।’
ফুফু এসে বললেন, খুব তো গল্প হলো। এখন সবাই ঘুমাতে যাও। নায়িম বললো, তোমাদের স্কুলে অনেক মজা, মাহির ভাইয়া।<
[‘প্রিয় বই’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশ- দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩১ মার্চ ২০১৮।]

[শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা এই গল্পটির অধিকাংশ বাক্যে যুক্তবর্ণ নেই এবং ৮ শব্দের অধিক কোন বাক্যে নেই।]
১৩ মার্চ ২০১৮। মোহাম্মদপুর, ঢাকা। Email: rahamot21@gmail.com

Click Here to see the article

Please follow and like us:
About Md. Rahamot Ullah 427 Articles
Principal Kisholoy Balika Biddaloy O College, Mohammodpur, Dhaka, Bangladesh. Phone- +88 017 111 47 57 0 (Educationist, Rhymester, Story-writer, Biographer, Essayist and Lyricist of Bangladesh Betar & Bangladesh Television.)

1 Comment on শিশুতোষ গল্প- ’প্রিয় বই’ -জনকন্ঠ- ৩১ মার্চ ২০১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


5 × 2 =